তাহসিফের মৃত্যু: দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার দিকে সন্দেহ রাষ্ট্রপক্ষের
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে যাওয়ার ভিডিও ধারণ করে, তা ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির খুন হতে পারেন বলে সন্দেহের কথা আদালতকে জানিয়েছিল রাষ্ট্রপক্ষ। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দেশি- বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার জড়িত থাকার সন্দেহের কথা প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাতের আদালতে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) তাহসিফ সাউরির ‘বন্ধুস্থানীয় ছোটভাই’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সাত দিনের রিমান্ড আবেদনের শুনানিতে এ সন্দেহের কথা জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন।
দীপের প্রথম দফায় রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল হক দিদার সন্দেহ প্রকাশ করে আদালতে বলেছিলেন,‘ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার ভিডিও করেছিলেন তাহসিফ সাউরি। পরবর্তীকালে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছাড়া হয়। এ কারণে ভিকটিমকে খুন করা হতে পারে।’
চার দিনের রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার দীপকে আদালতে হাজির করে ৮ কারণ দেখিয়ে ফের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজীপুরের টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইন্সপেক্টর ফিরোজ উদ্দিন।
রিমান্ডের পক্ষে কারণগুলো তুলে ধরেন ইন্সপেক্টর ফিরোজ উদ্দিন। প্রসিকিউটর সুমন রিমান্ড মঞ্জুরের প্রার্থণা করে বলেন,‘গত ২৭ অক্টোবরের ঘটনা। এ আসামি ভিকটিমকে ওই দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে বাসা থেকে ডেকে নেন। তারা নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে যান। সেখান থেকে টঙ্গীর মাজার বস্তিতে যান। সেখান থেকে যান তুরাগ নদীর পাড়ে। সেখান থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। একজন নদীতে পড়ে যান। আর এ আসামি বাসায় চলে যান।’
তিনি বলেন,তার সহকর্মী বা বন্ধু যে নদীতে পড়ে গেছেন, হারিয়ে গেছেন, তার কী হয়েছে না হয়েছে এ বিষয়ে উৎকণ্ঠা দেখা যায়নি। বিষয়টি কাউকে জানানওনি। পরে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। মামলায় সম্পৃক্ত থাকায় গ্রেফতার দেখিয়ে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ডে তিনি ভাসা ভাসা তথ্য দিয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানার জন্য তাকে আবারও সাত দিনের রিমান্ড প্রয়োজন।’
সুমন বলেন,‘ঘটনার সাথে অন্য কোনো রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত কি না। আমরা এনায়েত করিম চৌধুরী, ভারতীয় নাগরিক রবিউলকে ইসলামকে গ্রেফতার করেছি। তাদের মোটিভ আর এই আসামিকে রিমান্ডে নেওয়ার পর মোটিভ একই মনে হচ্ছে। এ আসামি যেমন- ভাসা ভাসা তথ্য দিচ্ছেন, তারাও একই রকমভাবে তথ্য দিয়েছিলেন। আমরা সন্দেহ করি, তাহসিফকে দেশি ও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা পরিকল্পিতভাবে হত্যা করতে পারে। তার (দীপের) সাত দিনের রিমান্ড প্রার্থণা করছি।’
প্রসিকিউটর সুমন অঅরও বলেন,‘আসামির আইনজীবী রিমান্ড বাতিলের প্রার্থনা করেছিলেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত এ আসামির পুনরায় তিন দিনের রিমান্ড দিয়েছেন।’’
আবেদনে বলা হয়, ‘মামলার ঘটনাটি একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা। এ মামলার ঘটনায় তাহসিফ সাউরি মৃত্যুর আগে আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ ও এক তরুণীর সঙ্গে ঘোরাফেরাসহ বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে খাবার খেয়েছেন। এ যাবত প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে প্রকাশ পায়, সাউরিকে মৃত্যুর আগে শেষ বারের মতো তাদের সাথে দেখা গেছে। এই অবস্থায় আসামিরা কোনো না কোনোভাবে মামলার ঘটনার সাথে জড়িত রয়েছেন মর্মে পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে মামলার মূল রহস্য উদঘাটনসহ মামলার ঘটনার সাথে জড়িত প্রকৃত আসামিদের গ্রেফতার করাসহ ৮ কারণে আসামিকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরো সাত দিনের পুলিশ রিমান্ড প্রয়োজন।
রিমান্ড আবেদনে যে ৮ কারণ তুলে ধরা হয়েছে
১. সংগৃহীত বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক ক্লোজড সার্কির ক্যামেরার ভিডিও পর্যালোচনা করে দীপের উপস্থিতিতে যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষল ও পর্যবেক্ষণ করা।
২. ভিকটিমের সাথে দীপ নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে থাকার সময়, কিছু সময়ের জন্য অন্যত্র সরে গিয়ে ১৫/২০ মিনিট কোথায় যোগাযোগ করেছেন তা পর্যালোচনা করা।
৩. ভিকটিম ও দীপসহ অন্যান্যদের ব্যবহৃত প্রাসঙ্গিক মোবাইলের সিডিআর সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা।
৪.মামলার ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন।
৫.অজ্ঞাতনামা অপর আসামিদের গ্রেফতারর ও শনাক্ত।
৬. আলামত উদ্ধার।
৭. মোটিভ অব মার্ডার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ।
৮.এছাড়া হত্যাকাণ্ডের স্থান নির্ধারণ করার লক্ষ্যে।
এর আগে গত শনিবার প্রথম দফায় দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ‘ভিডিও ধারণকারী’ হিসেবে আলোচনায় থাকা তাহসিফ সাউরির ভাসমান লাশ গত ২৮ অক্টোবর বিকালে তুরাগের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। তিনি ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় ‘দীপের ডাকে’ বাসার নিচে নামেন এবং নিজের বাইক নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন।
দীপ ২৯ অক্টোবর বলেছিলেন, রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকা থেকে তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান। তিন দিনেও মামলা না হওয়ায় তাকে নিয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে, সেই আলোচনার মধ্যে ৩০ অক্টোবর রাতে তাকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই দিন রাতে তাহসিফের বাবা মামলা করার পর নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে তাহসিফের সঙ্গে থাকা তরুণীকে গ্রেফতার দেখানো হয়। পরদিন দীপকে চার দিনের রিমান্ড দেয় আদালত।
এছাড়া দীপের দেওয়া তথ্যেই ৩০ অক্টোবর সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের বাইকটি উদ্ধার করা হয়। ‘মাদকস্পট’ হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় মধ্যরাতে তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার কথা স্বীকারও করে দীপ। একপর্যায়ে তাকে নিয়ে শুক্রবার টঙ্গীর ওই এলাকা পরিদর্শনেও গিয়েছিলেন পিবিআই কর্মকর্তারা।
এ মামলায় রবিবার তাহসিফ সাউরির ‘বান্ধবী’কে চার দিনের রিমান্ড দেয় আদালত।

