সিলেটে ১৭৯ মৃত্যুতেও থামেনি হাম; সঙ্গে বাড়ছে ডেঙ্গু
সিলেটে হাম পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। একের পর এক কোমলমতি শিশুরা ভর্তি হচ্ছে হাসপাতালে। থামছে না মৃত্যুও। এর মধ্যেই নতুন করে বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ১৬ জনের শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে সন্দেহজনক হাম রোগে মারা গেছে আরও এক শিশু। হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ১৬৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় দপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে সিলেট বিভাগে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯ জন। সন্দেহজনক ও নিশ্চিত হাম রোগে মৃত্যু হয়েছে ১৭৯ জনের।
এই মৃত্যুর বড় অংশই সন্দেহজনক হাম রোগী। এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে ১৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিশ্চিত হাম রোগে মারা গেছেন আরও ১০ জন।
মৃত্যুর এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ১৭৯টি পরিবার এবং চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর তৈরি হওয়া দীর্ঘস্থায়ী চাপ।
মৃত্যু বেশি সিলেটে ও সুনামগঞ্জে
জেলাভিত্তিক হিসাবে হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে সিলেটে। জেলায় মৃতের সংখ্যা ৭২ জন। সুনামগঞ্জে মারা গেছেন ৬৬ জন। হবিগঞ্জে ২৬ এবং মৌলভীবাজারে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সন্দেহজনক হাম রোগে সিলেটে ৬৮, হবিগঞ্জে ২২, মৌলভীবাজারে ১৪ এবং সুনামগঞ্জে ৬৫ জন মারা গেছেন।
অন্যদিকে নিশ্চিত হাম রোগে সিলেটে চারজন, হবিগঞ্জে চারজন, মৌলভীবাজারে একজন এবং সুনামগঞ্জে একজন মারা গেছেন।
এদিকে, হাম রোগীর চাপের সবচেয়ে বড় চিত্র পাওয়া যাচ্ছে হাসপাতালগুলোতে। গত ২৪ ঘণ্টায় শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৬০ জন এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৪ জন সন্দেহজনক হাম রোগী ভর্তি হয়েছেন। রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তিনজন। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন আরও পাঁচজন। মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১৭ জন এবং সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৩৫ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫৬৩ জন সন্দেহজনক হাম রোগী। এর মধ্যে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই রয়েছেন ২৪৫ জন। শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৬৭ জন। অর্থাৎ শুধু সিলেট শহরের দুটি সরকারি হাসপাতালে ৪১২ জন সন্দেহজনক হাম রোগী চিকিৎসাধীন।
গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যায় সিলেট সদর উপজেলার মাহমুদ আলির আট মাস বয়সী শিশু ফাবিহা। সন্দেহজনক হাম রোগে শিশুটি মারা গেছে স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন মৃত্যুর ঘটনা হাম পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি।
চলতি বছর নিশ্চিত হাম রোগীর হিসাবে সুনামগঞ্জ এগিয়ে রয়েছে। জেলায় নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩৫৭ জন। সিলেটে ৩৯৬ জন, হবিগঞ্জে ১৫৮ এবং মৌলভীবাজারে ১৫৮ জন। হবিগঞ্জের হিসাবের মধ্যে রুবেলা আক্রান্ত দুজনও রয়েছেন।
এদিকে, হামের সঙ্গে এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে ১২ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু না হলেও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩২ জন।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভাগে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ৩৯৮ জনের। এর মধ্যে হবিগঞ্জে ১৭২ জন। সিলেটে ৮৭, সুনামগঞ্জে ৮৫ এবং মৌলভীবাজারে ৪১ জন। বিভাগের বাইরে থেকে এসে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে আরও ১৩ জনের।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছর সিলেট বিভাগে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন তিনজন। তন্মধ্যে সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে একজন করে মারা গেছেন। সুনামগঞ্জে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর তথ্য নেই।
গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত ১২ ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে সাতজনই হবিগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালে শনাক্ত হয়েছেন। হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে তিনজন, লাখাইয়ে তিনজন এবং চুনারুঘাটে একজনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ একসঙ্গে বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। বর্তমানে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ জন ডেঙ্গু রোগীও চিকিৎসাধীন রয়েছেন। একই হাসপাতালে ২৪৫ জন সন্দেহজনক হাম রোগী ভর্তি রয়েছেন। একই সময়ে একটি হাসপাতালে দুই ধরনের সংক্রামক রোগীর চিকিৎসা চলছে।
সেপ্টেম্বরের শেষদিকে এসেও হাম ও ডেঙ্গুতে নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। ফলে সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে নজরদারি জোরদারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। হাসপাতালগুলোতে নতুন রোগী ভর্তি অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গুও নতুন করে ছড়াচ্ছে। ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত ৩৯৮ জন।
স্বাস্থ্য অধিপ্তর সিলেটের পরিচালক মাহবুবুল আলম বলেন, সিলেটে হামের টিকাদান শুরু হয়েছে। ইনটেন্সিফাই এম আর ক্যাম্পেইন। মে মাসে যারা বাদ পড়েছে, তাদের দেওয়া হবে। সিলেট বিভাগে ৬ মাস থেকে ৫ বছরের ৩ লাখ ২১ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। এ জন্য রুটিনমাফিক নির্দিষ্ট ইপিআই কেন্দ্রগুলোতে টিকা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, সারা দেশে হাম আক্রান্ত কমলেও সিলেটে কমছে না। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, অনেক মানুষ টিকা নেয় না। তাছাড়া হাওর অধ্যুষিত এলাকার মানুষ টিকা নিতে অনীহা প্রকাশ করে। যে কারণে হাম আক্রান্ত ও মৃত্যু থামছে না।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে গত বুধবার জনসচেতনতামূলক একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সভায় সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায় করছি। এর সুফলও মিলছে। তবে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তারা স্থানীয়বাবে হননি। অন্য অঞ্চলের ভ্রমণ ইতিহাস রয়েছে। তারপরও এ বিষয়ে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, সিসিকের পক্ষ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক লিফলেট বাসা-বাড়িতে পৌছে দিতে হবে। বাসা-বাড়ি পরিচ্ছন্ন রাখা এবং কোথাও পানি জমিয়ে না রাখার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, এডিস মশার বিস্তার রোধে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। কোথাও যাতে পানি জমে এডিস মশার প্রজনন না হয়, সেদিকেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সে ক্ষেত্রে নগরবাসীরও সহযোগীতা চান তিনি।

