হুথিদের বিরুদ্ধে সউদী সেনাদের জীবন উৎসর্গের প্রস্তুতির আহ্বান গ্র্যান্ড মুফতির
ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনি গোষ্ঠী হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সউদী আরবের সীমান্তে দায়িত্ব পালনরত সেনাদের প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির গ্র্যান্ড মুফতি শেখ সালিহ বিন ফাওজান আল-ফাওজান। বৃহস্পতিবার রাতে দেওয়া এক বিরল ও কঠোর ভাষার বিবৃতিতে তিনি দেশের ভূখণ্ড রক্ষা এবং হুথিদের মোকাবিলাকে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন।
সউদী প্রেস এজেন্সিতে (এসপিএ) প্রকাশিত বিবৃতিতে গ্র্যান্ড মুফতি বলেন, দেশের সুরক্ষা এবং এর ভূখণ্ডের এক ইঞ্চিও যারা অবৈধভাবে হস্তক্ষেপ করতে চায়, তাদের প্রতিহত করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবন ও আত্মা উৎসর্গ করার মানসিক প্রস্তুতি থাকা উচিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সীমান্তে মোতায়েন সেনা ও জোট বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে তিনি দায়িত্ব পালনে ধৈর্য, দৃঢ়তা ও ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে শাসক ও মাঠপর্যায়ের কমান্ডারদের নির্দেশ মেনে চলা এবং সামরিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি মুসলমানদের পবিত্র স্থানসমূহ রক্ষার দায়িত্বের কথাও উল্লেখ করেন।
বিবৃতিতে হুথিদের কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে আল-ফাওজান বলেন, তাদের মোকাবিলা এবং ইয়েমেনে সউদী-সমর্থিত সরকারের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা জরুরি দায়িত্বগুলোর অন্যতম। তিনি সউদী আরব ও ইয়েমেনকে ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা এবং হুথি ও তাদের সহযোগীদের পরাজয়ের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।
সউদী আরবের গ্র্যান্ড মুফতি দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ। তিনি একই সঙ্গে কাউন্সিল অব সিনিয়র স্কলার্সের চেয়ারম্যান এবং জেনারেল প্রেসিডেন্সি অব স্কলারলি রিসার্চ অ্যান্ড ইফতার প্রধান। ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর রাজকীয় আদেশে শেখ সালিহ বিন ফাওজান আল-ফাওজানকে গ্র্যান্ড মুফতি নিয়োগ দেওয়া হয়। একই আদেশে তাকে মন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে গ্র্যান্ড মুফতির এই প্রকাশ্য বক্তব্যকে বিরল বলে উল্লেখ করেছে রয়টার্স। সংস্থাটি জানিয়েছে, সীমান্তে অবস্থানরত সেনাদের উদ্দেশে দেওয়া বার্তাটিতে কোরআনের আয়াত ও মহানবী (সা.)-এর বাণীর আলোকে দেশের প্রতিরক্ষা ও আত্মত্যাগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ইয়েমেনকে ঘিরে সউদী আরব ও হুথিদের মধ্যে কয়েক বছরের তুলনামূলক স্থিতিশীলতার অবসান ঘটেছে। ২০২২ সালের মার্চে কার্যকর হওয়া অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির পর গত ১৩ জুলাই হুথিরা সউদী আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। সউদী নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছিল, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের দিকে ছোড়া হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে প্রায় চার বছর পর দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি সামরিক উত্তেজনা ফের প্রকাশ্যে আসে।
এরপর গত কয়েক সপ্তাহে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর পাশাপাশি ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। কৌশলগত বন্দরনগরী মোকাসহ লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাদের অগ্রগতির ফলে নতুন করে বাস্তুচ্যুতি শুরু হয়েছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার হিসাবে, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে ইয়েমেনে এক লাখ ১২ হাজারের বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং প্রায় ৩ হাজার মানুষ সমুদ্রপথে জিবুতিতে পালিয়েছে।
২০১৪ সালে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হুথিরা দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ২০১৫ সালে রাজধানী সানা দখল করে। এরপর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদি সউদী আরবে চলে যান। তার সরকারকে পুনর্বহালের লক্ষ্যে ২০১৫ সালে সউদী নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও চলতি বছরের জুলাই থেকে আবারও বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স, সউদী প্রেস এজেন্সি, আরব নিউজ

