স্থানীয় নির্বাচনের আগে নতুন জেলা কমিটির দাবি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে সিলেট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির দাবি জানিয়েছেন নেতৃবৃন্দ। সেইসাথে সিটি করপোরেশন থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দল থেকে একক প্রার্থী দেওয়ারও দাবি জানানো হয়। তবে মুখ দেখে বিবেচনা না করে আন্দোলন সংগ্রামে ত্যাগী-পরিক্ষিতদের মূল্যায়নের করারও দাবি জানান।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জেলা পরিষদ মিলনায়তনে সিলেট জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সভায় এমন দাবি জানান জেলা ও উপজেলা কমিটির নেতৃবৃন্দ।
জবাবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আলহাজ্ব জি কে গউছ বলেন, যেকোনো নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্ত মানতে হবে। যিনি দলের সিদ্ধান্ত মানবেন না, তিনি দলের পরিচয় বহন করতে পারবেন না। তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা ঐক্যবদ্ধ থেকে যেকোনো অপশক্তির মোকাবিলা করব। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেভাবে দেশ পরিচালনা করছেন, সাধারণ মানুষ বলছে- এরকমই রাষ্ট্রনায়ক আমাদের প্রয়োজন। ৫ আগস্ট থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা ঐক্যবদ্ধ থেকে যেকোনো অপশক্তির মোকাবিলা করব।
একইভাবে মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সভায়ও তিনি নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশনা দিয়ে জি কে গউছ বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে দল থেকে বাছাই করে একক প্রার্থী দেওয়া হবে। দল যাকে প্রার্থী দেবে, তাকে বিজয়ী করতে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিস্টদের সাথে যাদের সম্পর্ক আছে, তাদের কোনোভাবে সুযোগ দেওয়া যাবে না। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কেই চলে গেলে অতীতের মতো ফেরার সুযোগ নেই। কেননা, আগে বিএনপির পুঞ্জি ছিল না। এখন পুঞ্জির অভাব নাই।
বৈঠক শেষে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আব্দুল আহাদ খান জামাল আব্দুল আহাদ বলেন, বৈঠক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ সিলেট জেলা বিএনপির নতুন কমিটির দাবি জানানো হয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনের আগে আহ্বায়ক কমিটি দেওয়ার দাবি তোলা হয়।
তিনিসহ নেতৃবৃন্দ দলের নতুন কমিটি দেওয়া ছাড়াও স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী করার দাবি জানিয়েছেন। সিটি, নির্বাচনে নতুন মুখ যাতে প্রার্থী দেওয়া হয়। যারা রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে ত্যাগী ও পরিক্ষিত, সেসব নেতাদের যেনো প্রাধান্য দেওয়া হয়। অবশ্য জেলা বিএনপিতে তিনি নিজেকে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছেন।
সিলেট জেলা বিএনপি সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, জেলার ১০৭টি ইউনিয়ন রয়েছে। আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কেন্দ্রের নির্দেশনায় প্রার্থী দেওয়া হবে। আর এই সিদ্ধান্তের বাইরে গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে বাছাই প্রক্রিয়ায় ইউনিয়ন থেকে উপজেলা এরপর জেলার কাছে বাছাইকৃত প্রার্থীদের তালিকা আসবে। পরবর্তীতে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
জেলা বিএনপির মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা ২০২২ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে দায়িত্ব নিয়েছি। দলের চেয়ারম্যান যুক্তরাজ্যে থাকাকালে জুম মিটিংয়ে বলেছিলেন, জেলা কমিটি কাজ করবে। জাতীয় নির্বাচনের পর সিদ্ধান্ত নেবো। বিএনপির চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় কমিটি বহাল আছে।
তিনি আরও জানান, সভা থেকে বালাগঞ্জ ও জকিগঞ্জে শূণ্য পদে দুজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বালাগঞ্জের সভাপতি না জানিয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাস করায় তার পরিবর্তে লুৎফুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয় এবং জকিগঞ্জ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বহিস্কার থাকায় তার পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে আবুল হাসানকে। স্থানীয় নেতাকর্মীর দাবির প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, রাতে মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায়ও প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আলহাজ্ব জি কে গউছ।
সভা শেষে মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন বলেন, নগরীর ৪২টি ওয়ার্ডের মধ্যে বেশ কয়েকটির নেতৃবৃন্দের কথা শোনেন প্রধান অতিথি। তারা তাদের অভিযোগ-অনুযোগও তুলে ধরেন। কয়েকটি ওয়ার্ডের বক্তব্য শোনে তিনি নীতিনির্ধারনী বক্তব্য দেন। এরপর অংগসংগঠনের বক্তব্য শোনে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন।
তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে লিখিত গাইড লাইন থাকবে কারা সিসিক নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী হতে পারবে। এরপর প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে তার যোগ্যতা প্রমাণ করে বাছাই করা হবে। এবার কেউ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গেলে ফেরার সুযোগ নেই। আগে পুঞ্জি ছিল না, যে কেই যা ইচ্ছা করতে পেরেছে। এখন পুঞ্জির অভাব নাই। তাই দলের বিরুদ্ধে কেউ গেলে সাংগঠনিকভাবে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
জেলা বিএনপির সভায় দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, “জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে দলকে সংগঠিত থাকতে হবে। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের ভোটে যাতে প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়, সে ব্যবস্থা রাখতে হবে। সংগঠনের ক্ষতি হয়- এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। মতপার্থক্য ভুলে দলকে ভালোবেসে স্থানীয় নির্বাচনে ত্যাগ স্বীকার করে যোগ্যদের এগিয়ে দিতে হবে।”
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা তাহসিনা রুশদির লুনা এমপি বলেন, “দল সরকারে আছে- এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংগঠনকে সুদৃঢ় রাখতে হবে। ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে- এমন নেতৃত্বকে নির্বাচিত করতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে অবমূল্যায়ন করা হবে না।”
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মোহাম্মদ আব্দুল মালিক এমপি বলেন, “যারা ১৭ বছর বিএনপির আন্দোলনে ছিলেন, তারাও জুলাই যোদ্ধা। ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচনে দলের প্রকৃত নেতাকর্মীদের বাছাই করা হবে, যাতে তারা বিজয়ী হতে পারেন।”
বিএনপির সিলেট বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ্ সিদ্দিকী বলেন, “দলের তৃণমূল থেকে নেতৃত্ব বাছাই করা হবে। যারা চরিত্র হারাননি, তাদের নির্বাচিত করা হবে। সংগঠনকে গতিশীল করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।”
সভাপতির বক্তব্যে সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “স্থানীয় নির্বাচনে একজন প্রার্থীকে সবদিক দিয়ে যোগ্যতার মাপকাঠিতে নির্ধারণ করা হবে। সাধারণ মানুষের মাঝে তার গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে মেলবন্ধনের মাধ্যমে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। এ ব্যাপারে সিলেট জেলা বিএনপি মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।”
সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী এমপির সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাঈদ আহমদ, প্রচার সম্পাদক লোকমান আহমদ, সিলেট সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. আবুল কাশেম।
আরও বক্তব্য রাখেন, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বজলুর রহমান ফয়েজ, গোলাপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি নোমান আহমদ মুরাদ, ওসমানীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস টি এম ফখর উদ্দিন, বিয়ানীবাজার উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আহমদ রেজা, বালাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম. মুজিবুর রহমান চেয়ারম্যান, গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিন, জৈন্তাপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুর রশিদ চেয়ারম্যান, গোলাপগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, বিশ্বনাথ পৌর বিএনপির সভাপতি আব্দুল হাই, বিয়ানীবাজার পৌর বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান রুমেল, কানাইঘাট পৌর বিএনপির সভাপতি নুরুল হোসেন বুলবুল, জকিগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি মাসুক আহমদ, কোম্পানিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাজী আব্দুল মন্নান, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এস এম তছলিম আহমদ নেহার এবং জকিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আহমেদ।
জেলার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কৃষক দলের আহ্বায়ক ইকবাল আহমদ, যুবদলের সভাপতি অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম মোমিন, স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আব্দুল আহাদ খান জামাল, মহিলা দলের সভানেত্রী তাসনিম শারমিন তামান্না, তাঁতী দলের সদস্য সচিব আলতাফ হোসেন বিলাল, আইনজীবী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক এড. ওবায়দুর রহমান ফাহমী এবং জাসাসের সদস্য সচিব রায়হান হোসেন খান।

