ছাতকে স্কুল ফিডিং: নামেই পুষ্টি, কাজে শুভঙ্করের ফাঁকি!
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচিতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। পুষ্টিকর ও মানসম্মত খাবার সরবরাহের কথা থাকলেও শিক্ষার্থীদের দেওয়া হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ পাউরুটি ও পচা ডিম। এছাড়া দুধ ও ফল বিতরণে চরম অনিয়মের ফলে সরকারের লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নিম্নমানের এসব খাদ্য গ্রহণে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ১৮৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩২ হাজার ৯২২ জন শিক্ষার্থীর জন্য গত ৪ এপ্রিল থেকে খাদ্য সরবরাহ শুরু করে ‘হাসান এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, সাপ্তাহিক খাদ্য তালিকায় রোববার পাউরুটি; সোমবার পাউরুটি ও তরল দুধ; মঙ্গলবার বিস্কুট ও মৌসুমি ফল এবং বুধ ও বৃহস্পতিবার পাউরুটি ও সিদ্ধ ডিম দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই তালিকার তোয়াক্কা করছে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।
অভিযোগ উঠেছে, প্রতি সোমবার দুধ সরবরাহের নিয়ম থাকলেও গত দুই সপ্তাহে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে মাত্র একদিন দুধ দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে একবারও দুধ পৌঁছায়নি। একইভাবে মৌসুমি ফল বিতরণেও রয়েছে চরম অনিয়ম। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ৪ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত সঠিক পরিমাণে দুধ ও কলা সরবরাহ না করে বিল উত্তোলন করা হলে মাত্র ১২ দিনেই সরকারের অন্তত ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে ফল ও দুধ ছাড়াই শুধু বিস্কুটের একটি বিল উত্তোলন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
কালারুকা ইউনিয়নের মহনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিখিল রায় জানান, ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত তার বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা কোনো দুধ পায়নি। চাইরচিরা রণমঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিউলি দাশ অভিযোগ করেন, পাউরুটির মান খুবই নিম্নমানের এবং অনেক ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ। ১৯০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে খাবার দেওয়া হয় ১৫৩ জনকে।
একই চিত্র গদারমহল, কাশিপুর চিকনাকান্দি ও চারিগ্রাম চরদুর্লভ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শিক্ষকরা জানান, ডিম সিদ্ধ করে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও সরবরাহ করা হচ্ছে কাঁচা ডিম। অনেক ক্ষেত্রে প্রতি কার্টনে ৪-৫টি পচা ডিম পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া দুধ ও কলা মাসে মাত্র একদিন সরবরাহ করা হয়েছে বলে একাধিক প্রধান শিক্ষক নিশ্চিত করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে হাসান এন্টারপ্রাইজের ছাতক সুপারভাইজার রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা দুধ ও বিস্কুট দিচ্ছি না, শুধু কলা, পাউরুটি ও ডিম সরবরাহ করছি। শুরুতে কিছু ভুলত্রুটি হলেও এখন তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে।
ডিম সিদ্ধ করার জন্য প্রতি ডিমে ১ টাকা ৫০ পয়সা করে বিদ্যালয়কে দেওয়া হচ্ছে দাবি করে তিনি উল্টো শিক্ষকদের ওপর দায় চাপান। তবে দুধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক-এর সংশ্লিষ্ট নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।
এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান আহমদ বলেন, ২২ হাজার কোটি টাকার এই বৃহৎ প্রকল্পটি কেন্দ্র থেকে সরাসরি মনিটরিং করা হচ্ছে। আমরা প্রথম মাসের শুধু বিস্কুটের বিলে ছাড়পত্র দিয়েছি। রুটিন অনুযায়ী যেসব খাদ্যপণ্য সরবরাহ করা হয়নি, তার সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে অনিয়ম পাওয়া গেলে পরবর্তী বিলের সুপারিশ করা হবে না।
অভিভাবক ও সচেতন মহলের দাবি, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা ও সরকারি অর্থের অপচয় রোধে দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
